চাঁদের আলো

ঠিক হলো আগামীকাল সকালে আমার ছোটো চাচার সাথে মায়ের বিয়ে হবে। বিকালে বিয়ের বাজার করে উঠানে রাখা হয়, বিয়ের বাজার সবাই উৎসাহ নিয়ে দেখে। মা শুধু কেমন ছলছল চোখে সবকিছু তাকিয়ে দেখেন। আমার বাবা আটমাস হয় পৃথিবী থেকে চলে গেছে। মায়ের আর আমার একটা আশ্রয় দেওয়ার জন্যে মায়ের বিয়ে ঠিক করা হয় ছোটো চাচার সাথে। 

ছোটো চাচা মানুষটা তেমন ভালো না, গভীর রাত করে বাড়িতে ফিরেন। একবার বিয়ে হয়েছিলো, কথায় কথায় চাচিকে খুব পেটাতেন। একসময় চাচির ভাইয়েরা এসে তাকে নিয়ে যায়। এরপর বিয়ের অনেক চেষ্টা করলেও ছোটো চাচাকে কেউ মেয়ে দিতে চায়নি। 

ছোটো চাচার সাথে মায়ের বিয়ে আমার দাদীই  ঠিক করেন। আমার মা তখন কিছুই বলতে পারেনি। তার ভাইয়েরা মানে মামারাও এই বিয়েতে রাজি। কারন মা আমাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে চলে যাবে এই দুঃশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে তারা, এতে তাদের জন্যেও সুবিধা হলো। তবে আমার মায়ের কথা কেউ ভাবেনি।’

কথাগুলো বলে লোকমান তালুকদার পাশের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালেন, পানি খেয়ে আবার অন্য কথায় চলে যায়। কারণ তার বাসায় কাজ করা একজন লোক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আমি বুঝতে পারি তিনি এই লোকটার সামনে নিজস্ব কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করছেন।

এই বাড়িতে আমি ঘন্টা খানেক হয় এসেছি। বাড়ির ভিতরে এসে দেখতে পাই বড়ো আমগাছের নিচে পাটির উপর একজন লোক খালি গায়ে বসে আছেন। পরনে একটা লুঙ্গি, সামনেই একটা প্লেট। প্লেটে ভাত সাথে ভাজা শুকনো মরিচ আর পেঁয়াজ ।

লোকটা আমাকে ইশারা দিয়ে বসতে বলেন, আমি জুতা খুলে পাটির উপরেই বসি।

আমার সামনে বসা এই লোকটার নাম লোকমান তালুকদার। গত সপ্তাহে পত্রিকায় আমার একটা লেখা ছাপা হয় ‘আলু দিয়ে মাংস’ শিরোনামে। পত্রিকাতেই তিনি আমার লেখা পড়ে ফেইসবুক আইডি খুঁজে বের করেছে। বরিশাল শহর থেকে নয় কিলোমিটার ভিতরে জামশেদপুর গ্রামে তিনি থাকেন। লোকটা আমাকে বলেন, তিনি তার জীবনের একটা ঘটনা আমাকে দিয়ে লেখাতে চান, সাথে আমার লেখার সম্মানী হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা দিবেন। আমি যেনো তার দাওয়াত কবুল করি তাই বিশেষ অনুরোধ করেন।

আমার একাউন্ট নাম্বার দিতেই ঘন্টা খানেক পরেই টাকা এসে যায়। আমি ঠিক করি সময় করে একদিন জামশেদপুর যাবো। যাওয়া আসা মিলিয়ে চার পাঁচশো টাকা খরচ হবে, তাছাড়া নতুন জায়গা, নতুন গল্পো। লোকটার গল্পোও শোনা যাবে। আমি তার সাথে দেখা করতে চলে আসি। জামশেদপুর বাজারে নেমে, লোকমান ডাইরেক্টারের বাড়ি যাবো বললেই একজন রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এসে বলে, চলেন আমি যাবো। বাড়িটা গ্রামের দিকে, দুই পাশে ধানের ক্ষেত, ছোটো পিচের রাস্তা।

এই বনের ভিতরে যে এতো সুন্দর বাড়ি থাকতে পারে কখনো মনে হয়নি। বাড়িটা দোতলা, সামনেই নামফলকে লেখা ‘লুনা কটেজ’ বাড়ি ভর্তি ফুলগাছ, এতো ফুলগাছ একসাথে এর আগে কখনো দেখিনি। 

পাটির উপরে বসতেই একজন লোক এসে চা বিস্কুট দিয়ে যায়। মনে হলো সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো, লোকটি কেবল আমার আসবার অপেক্ষা করেছেন।

লোকমান তালুকদার ইশারা দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে লোকটাকে বলেন, আগামী এক ঘন্টা এখানে তোরা কেউ আসবি না। মনে থাকবে? 

লোকটা বলে, হ্যাঁ মনে থাকবে।

লোকটা চলে যেতেই লোকমান তালুকদার বলে ‘বুঝলে গ্রামের মানুষের ভিতর একটা সমস্যা আছে। তাদের অন্যের জীবন নিয়ে অনেক আগ্রহ। তোমার সাথে কি বলছি এসব ওর শুনতেই হবে। বেশি আগ্রহ ভালো না। তুমি কি বলো?'

আমি মাথা নাড়িয়ে তার কথার সাথে সহমত জানাই। 

লোকমান তালুকদার একটা বড় শ্বাস নেয় তারপর আবার বলা শুরু করে ‘বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমার তিন ফুপুরা এসেছে। দুটো খাসি ও একটা গরু কেনা হয়েছে। গ্রামের মহিলারা এদিকে ওদিকে মাকে নিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে হাসাহাসি করে। মা এক কোনায় চুপচাপ বসে এদের তামাশা দেখেন। 

মায়ের মুখ দেখে আমারও খারাপ লাগে, তবে আমি তো ছোটো কিই বা করতাম বলো? তখন আমার বয়স সবে মাত্র সাত বছর। মন খারাপ নিয়ে মায়ের পাশে যেয়ে গুটিয়ে শুয়ে থাকি। 

মধ্যরাতে বাড়ি নিরব হয়ে উঠে, মা আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলেন। আমি চোখ মুছতে মুছতে বলি, মা সকাল হয়ে গেছে কি? মা আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলেন, সকাল হয়নি লোকমান আমরা এখান থেকে চলে যাবো কোনো কথা বলবি না। 

আমার পরনে একটা হাফ প্যান্ট মায়ের পেটিকোটের বাড়তি কাপড় দিয়ে বানিয়ে দেওয়া এই প্যান্ট। গায়ে কিছু ছিলো না, গায়ে দেওয়ার মতো কিছু খুঁজতে গেলে কেউ জেগে যেতে পারে। 

আমাদের ঘরের সাথেই দরজা ছিলো, দরজা খুলে বাগানের ভিতরে এসে যাই। বাড়ির সামনে দিয়ে বের হওয়া যাবে না, উঠানে কিছু পুরুষ মানুষ বসে আছে। 

এদিকে বাগানের মশারা আমার গায়ে কামড় বসিয়ে দিচ্ছে। মা বলেন, লোকমান শোন আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখবি ছাড়বি না। মা যেনো আমার উপর ভরসা রাখতে পারে না। শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাকে শক্ত করে বেঁধে হাত ধরেন। 

খাল ভর্তি পানি, এখন জোয়ার চলছে। বিশ থেকে পঁচিশ হাত লম্বা খাল মা আমাকে নিয়ে সাঁতরে এই পাড়ে আসে। খাল সাঁতরাতে যেয়ে আমার কাঁপুনি উঠে যায়।

কাঁপতে কাঁপতে নদীর ঘাটে আসি। নদী সাঁতরাতে মা পারবে না। তখনই মা যেয়ে একজন জেলের পা ধরে কান্না করে দেয়। মায়ের দেখাদেখি আমিও তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদি। 

লোকটা আমাদের নদী পাড় করে দিতে রাজি হয়। টিপটিপ করে নৌকায় হ্যারিকেন জ্বলছে আমরা অন্ধকার ঠেলে আলোর দিকে যাচ্ছি, আর জলের শব্দ। নদী পাড় হতে পারলেই বড়ো শহর আর কোনো চিন্তা নেই। 

নদী পাড় হয়ে কূলে উঠেছি তখন ফজরের আজান দেয়। 

আমরা দুদিন শহরের পথে পথে থাকি। রাত হলেই কোনো একটা বড় বিল্ডিংয়ের একপাশে যেয়ে শুয়ে থাকি, মা ঘুমায় না। আমার বালিশ হয় মায়ের কোল। 

দুদিন পরেই মা একটা কাজ পায়, একটা স্কুলের ঝাড়ুদাড়ের কাজ। ঝাড়ু দিতে হবে প্রতিদিন, মা রাজি হয়ে যান। আমাদের জন্যে সুবিধা হয়, রাতে আমরা একটা ক্লাসরুমে দুটো বেঞ্চ এক করে ঘুমিয়ে যাই। একটা পুরোনো বালিশও জোগাড় হয়ে যায়। 

মা স্কুলে কাজ করেন, স্যারদের জন্যে খাবার নিয়ে আসেন। 

মা একসময় স্কুলের স্যারের কাছে বলে আমাকে এখানে ভর্তি করিয়ে দেয়। স্কুলের সব স্যাররাই আমারে অনেক আদর করতেন। তারা কোনো কাজ দিলে আমিও করে দিতাম।

সেই স্কুল থেকেই আমি মেট্রিক পাশ করি। সব স্যারদের সহযোগিতায় আমার পড়াশোনা চলে, আমি সারাজীবন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। 

মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার পরে আমাকে নিয়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে যায়। পুরো বোর্ডে আমি প্রথম হই। সেদিন মায়ের কান্নাকে দেখে, মা কাঁদতেই থাকেন পরে বড় স্যার মাকে থামায়।

স্কুলের স্যারদের সহযোগিতায় কলেজে ভর্তি হই। আমি যে কলেজে পড়তাম তারা কেউ আমার থেকে টাকা নেয়নি। কলেজের ফান্ড থেকে আমার টাকা দিয়েছে। 

কলেজেও আমার রেজাল্ট ভালো হয়। আমি চেয়েছিলাম আর পড়াশোনা করবো না, মায়ের কষ্ট আর দেখতে ইচ্ছে করে না। কোনো একটা কাজ শুরু করে দিবো। 

কিন্তু মা চাইলেন আমি যেন আরো পড়াশোনা করি। আমাকে মস্ত বড়ো অফিসার বানাবেন। আমার মা অফিসার বলতে পারতেন না, বলতেন তুই বড়ো অসিসার হবি। মায়ের এই শব্দ ভুল হলেও মায়ের অনুভূতিতে ভুল ছিলো না।

মা স্কুলের কাজের পাশাপাশি একটা মিলে কাজ করা শুরু করে দেন। 

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মায়ের সাথে যোগাযোগ হতো কেবল চিঠিতে আর যখন শহর থেকে মায়ের কাছে যেতাম তখন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির খবর মায়ের কাছে দেওয়ার আগে মা জেনে যায়। পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়। স্কুল কলেজের স্যাররাই মায়ের কাছে চাকরির খবর জানিয়ে দেয়।

এই যে আমাকে দেখছো সবকিছু মায়ের কারণেই। এই এলাকায় আমাকে এখন এক নামে ডাইরেক্টার নামে সবাই চিনে। অবসরে গেছি দুই বছর হয়। ঠিক করেছি অবসরের পর গ্রামেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিবো। ছেলেমেয়েরা শহরে বড়ো হয়েছে তাদের চিন্তা ভাবনা আলাদা, বড়ো ছেলে দেশের বাহিরে আছে। এখানে আমি আমার স্ত্রী আর মাকে নিয়ে থাকি। ছোটো মেয়ের বিয়ে হয়েছে, সবার ছোটো ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি। 

লোকমান তালুকদার বলেন, এই বাড়িটা মায়ের নামে। আমার মায়ের নাম লুনা। চলো বাড়ির ভিতরে যাই মায়ের সাথে দেখা করবে।

বাড়ির ভিতরে আসতেই একটা ঘরে আসি, বিছানার উপর এক মহিলা বসে আছেন। চোখে চশমা, পাশেই একটা লাঠি রাখা। লোকমান তালুকদার বলেন, এই আমার মা। মা বলতেই দেখলাম তার চোখে পানি টলমল করছে। লোকমান তালুকদার মায়ের পাশে বসেই কোলের উপর মাথা রাখে, মহিলার মুখে দাঁত নেই তারপরও হাসছেন এটুকু বুঝা যায়। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, কে এই ছেলেটা। লোকমান তালুকদার বলেন, ও অনেক বড়ো লেখক। আমার হাসি পায়, আমি অতোটা বড়ো কোনো লেখক না। 

আমি সন্ধ্যাবেলা জামশেদপুরের লুনা কটেজ থেকে বের হই। লোকমান তালুকদার বলেন, তুমি কিন্তু আমাদের কথা লিখবে, আমি চাই আমার মায়ের কথা সবাই জানুক। আমি ভরসা দিয়ে বলি, লিখবো।

গ্রামের পথ দিয়ে গাড়ি চলছে, ঠান্ডা বাতাস এসে শরীর ছুঁয়ে যায়, দুইপাশে সবুজ ধানক্ষেত। সন্ধ্যায় বড়ো একটা চাঁদ উঠেছে, সেই চাঁদের আলোয় ধান ক্ষেত স্পষ্ট দেখা যায়। 

Post a Comment

0 Comments