অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন নিউজ পড়ে ফেলতে হয়।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন নিউজ পড়ে ফেলতে হয়। কত কি মনে পড়ে তখন! আমরা যখন খুব ছোট আমার মায়ের এক কাকাতো ভাইয়ের মেয়ে খুব মেধাবী ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্সে ফার্স্টক্লাস পেয়ে পাশ করলো। বোনকে দেখতে আমরা ছোটরা সবাই মিলে বড়দের সাথে গেলাম। সেই বোন আমাকে তার মাসুদ রানার সংগ্রহ দেখালো। আমি সেই কড়ে আঙ্গুল বয়সে জানলাম যারা দারুণ রেজাল্ট করে তারা অন্য বইও পড়ে। বড় হতে হতে শুনলাম আমার সেই দিদির এক অনেক বড়লোক ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে হয়েছে কিন্তু ছেলে শুধু ডিগ্রি পাশ। এরপর কয়েক বছর পর শুনলাম বোনটি, নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ। তাকে নানা ওষুধ খাওয়াতে হয়, মাঝে মাঝে না কি সিডেটিভের ইনজেকশনও পুশ করতে হয়। একদিন শুনলাম, দিদি অনেক অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন বয়স মাত্র ত্রিশ পেরোনোর আগেই। দিদি মারা যাবার চার মাস পর দিদির বর বিয়ে করলেন কারণ দিদির নামে তিনি মাত্র এক কোটি টাকার লাইফ ইন্সুরেন্স করেছিলেন, সেই টাকা পেয়ে তাঁর জীবন রঙ্গীন। 

না, দিদির পরিবার কোন কেইস করে নি। দিদি, বারবার ঐ বাসা থেকে বের হতে চাইলেও আবার তাঁর বাড়ির সবাই মিলে দিদির বরের কাছেই দিয়ে এসেছে। হাসি খুশি দারুণ পড়ুয়া ব্রিলিয়ান্ট সেই মেয়েকে কেউ মনে রাখে নি, একটা হাইফেনের মতো মুছে গেছেন এই বিপুলা পৃথিবী থেকে।

এত কথা কেন মনে পড়লো? 

সেই গত শতাব্দীর? 

কারণ কমেন্ট বক্সে দেয়া নিউজের লিংক।

আমাদের কন্যারা হয়তো বয়স অল্পের কারণে বাস্তব জগতের সাথে সংযুক্তি কম থাকায় কখনো সঙ্গী নির্বাচনে ভুল করে। তারা নির্যাতিত হলে তার নিজের পরিবার তাকে আর ফিরে আসতে দেয় না আবার বাবা মা নিজে বিয়ে দেন, সেই বিয়ে অকার্যকর এবিউসিভ হলে বাবা- মা কে বারবার জানালেও তারা কন্যা সন্তানকে জায়গা দেন না। সবাই বলেন, বিয়ের পরে এসব হয়, সবাইকেই এসব মানিয়ে নিতে হবে আর এসব কিছু মানিয়ে নিতেই কত মা- বোনের জীবন শুরু হবার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। 

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন শুধু জব করলেই আসে না। অনেক নারী জব করেন কিন্তু তার পাই-পয়সা খরচ হয় সংসারে, বরের হাতে থাকে সকল নিয়ন্ত্রণ। তারা নিজের অর্জিত অর্থ নিজের জন্য ব্যয় করার কোন অধিকার রাখেন না। তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন ধরনের সঞ্চয় থাকে না। আমি দুঃখিত হয়েছি প্যারেন্টসদের অবিমিশ্রকারীতা দেখে - জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির এর মেয়ে অংকন ইন্টার রিলিজিয়নে একজনকে পছন্দ করেছে। পরিবার কেন তাকে এই ভয়ংকর এবিউসিভ রিলেশন থেকে উদ্ধার করলো না, এ আমার কাছে এক বিস্ময়।

দ্বিতীয় ঘটনা আরও ইন্টারেস্টিং - ব্রাক্ষ্মণ আবার ডাক্তার ছেলে এ যেন একেবারে হীরার টুকরা তাই একমাত্র সন্তান, খেয়াল করেন একমাত্র কন্যা সন্তানকে বাবা মা অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে মাত্র পঞ্চাশ লক্ষ টাকা খরচ করে, বিয়ের পর মেয়ের পড়ালেখা অফ। ফ্ল্যাটের জন্য ছেলে পক্ষ উদয়াস্ত মেরে গেছে মেয়েকে, মেয়ের নামে সাতটা জিডি করেছে ছেলেরা। মেয়ে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ছিল কিন্তু মামলা করতে পারে নি কারণ ছেলের বাবা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথচ ছেলের পরিবার চট্টগ্রাম শহরে একটা প্রাইভেট হাসপাতালের ওয়ান অব দ্য ডিরেক্টরস, তাদের নিজেদের পয়সার অভাব নেই।

এই যে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ব্যয় করে মেয়েকে বিয়ে দেয়া এ কাজটা কেন? 

পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিয়ে মেয়েকে কি না পড়ানো যেত! মেয়ে নিজে ডাক্তার হয়ে এরকম ডাক্তার ১০ টা মর্দখানা বানিয়ে রাখতে পারতো। আমাদের বাবা মা-রা কেন কন্যা সন্তানের সংসার টিকে থাকার উপর নিজেদের সম্মানের পাল্লা দিয়ে বসে থাকেন আমার খুব জানার ইচ্ছা। আমার আদরের সন্তান তাকে আমি পেলে পুষে বড় করেছি কি অন্যের হাতে মার খাওয়ার জন্য, মরে যাবার জন্য? আমার কন্যা সন্তান বিয়ে না করে শুধু বেঁচে থাকলেই বা কী সমস্যা? ইন্টার রিলিজিয়নে বিয়ে করুক, নিজের রিলিজিয়নে বিয়ে করুক, বিয়ে করুক বা না করুক, লিভইনে থাকুক, যেভাবে ইচ্ছা থাকুক শুধু বেঁচে থাকুক।

আমাদের জনপদ প্রতি প্রাণের প্রতি এত নির্দয়! কারণ আমাদের বাবা মা-রা তাদের কন্যা সন্তানের প্রতি এক ধরনের বীভৎস নিষ্ঠুরতা লালন করেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

জানি লিখে কিছু হয় না, কেউ হয়তো বা পড়বে না এত দীর্ঘ লেখা। নিজের জন্য লিখলাম, কষ্ট লাঘবের আশায়।

মেয়েরা, যেহেতু খুব সহসা কোন সিস্টেম পরিবর্তিত হবে না তাই পুরুষতন্ত্র যা যা করে আপনিও তাদের সাথে তাই করুন -

√ নিজের জন্য অর্থ রাখুন

√ জয়েন্ট একাউন্টে ততোটুকুই রাখুন যতটুকু লোন পেমেন্টের জন্য লাগে

√ নির্যাতন টের পাওয়ার সাথে সাথে বের হবার চেষ্টা করুন, মূল্যবান প্রাণ দিবেন না, কেউ মনে রাখবে না।

√ পরিবারের সম্মানে উষ্টা মারুন।

√ বাবা মা ভাই বোন যদি আপনাকে ডিজ ওন করে তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা দরকারে নিবেন কারণ এরা নিপীড়নকারীর হাতকে শক্তিশালী করে নিজেদের সম্মানের দোহাই দিয়ে।

√ বিয়ে একটা অসম চুক্তি। এ চুক্তি প্রথম থেকেই ডিফেক্টিভ, তাই এ চুক্তি যদি না টেকার সম্ভাবনা দেখা দেয় এর জন্য নিজেকে দায়ী ভাববেন না।

√ প্রেম, ভালোবাসার চাইতে প্রাণের দাম বেশী। তাই ট্রমা বন্ডিং এ থাকবেন না।

√ যেখানে সম্ভব আইনের আশ্রয় নিন, নিজেকে বাঁচান। আজকে পারেননি তাতে কি, আগামীকাল অবশ্যই বের হয়ে আসুন। জীবন আপনার তাই চিন্তা আপনার।

যেসব পুরুষ ও নারী, একে অপরকে সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে এ জগতের প্রাণের চক্র বজায় রেখেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইলো।

Post a Comment

0 Comments